বিশ্বব্যাপী ছুটির মৌসুমের কেনাকাটায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ভূমিকা দ্রুত বাড়ছে। উপহার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া, দোকানভেদে পণ্যের দাম তুলনা করা, পণ্য সম্পর্কে ক্রেতাদের মতামত বা পর্যালোচনা দেখা কিংবা কেনাকাটা—সব কাজেই এখন ব্যবহার করা হচ্ছে এআই টুলের। চলতি বছরের ছুটির মৌসুমে এভাবে এআইয়ের সহায়তায় কেনাকাটার পরিমাণ ২৬৩ বিলিয়ন কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান সেলসফোর্স। খবর সিএনবিসি।
সেলসফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের মাধ্যমে হওয়া বিক্রির এ পরিমাণ বিশ্বব্যাপী মোট অনলাইন অর্ডারের ২১ শতাংশের সমান। অর্থাৎ এবারের ছুটির মৌসুমে প্রতি পাঁচটি অনলাইন অর্ডারের একটিই আসতে পারে এআই টুলের সাহায্য নিয়ে। ক্রেতারা এখন গুগলের প্রচলিত সার্চের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন এআই চ্যাটবটে প্রশ্ন করে কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি, গুগলের জেমিনি ও পারপ্লেক্সিটির মতো চ্যাটবট।
ভোক্তাদের মধ্যে এআই ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়ছে। ভিসা, জেটা গ্লোবালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে, ৪০ থেকে ৮৩ শতাংশ ভোক্তা চলতি ছুটির মৌসুমে অনলাইন কেনাকাটার কাজে এআই টুল ব্যবহার করতে পারেন। একই সময়ে অ্যাডোবির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ১ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বরের মধ্যে এআইয়ের সাহায্যে খুচরা বিক্রেতাদের ওয়েবসাইটে ভিজিট বা ট্রাফিক বেড়েছে ৭৬০ শতাংশ।
অ্যাডোবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জেনারেটিভ এআই প্লাটফর্মের মাধ্যম ব্যবহার করা ক্রেতারা অন্য উৎসের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি কেনাকাটা করেন। তারা ওয়েবসাইটে গড়ে ১৪ শতাংশ বেশি সময় থাকেন এবং তাদের মধ্যে দ্রুত সাইট ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতাও কম। এতে প্রতিবার ভিজিটে খুচরা বিক্রেতাদের আয় গড়ে ৮ শতাংশ বেশি হচ্ছে।
কেনাকাটায় এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নতুন কৌশল হাতে নিচ্ছে। ওয়ালমার্ট ও টার্গেট ওপেনএআইয়ের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে। ফলে গ্রাহকরা ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটির ভেতরেই পণ্য খুঁজে দেখা ও কেনাকাটা করতে পারবেন। এটসি ও শপিফাইয়ের অধীনে থাকা অনেক বিক্রেতাও ওপেনএআইয়ের ইনস্ট্যান্ট চেকআউট সুবিধা ব্যবহার শুরু করেছে, যার মাধ্যমে চ্যাটজিপিটির মধ্যেই কেনাকাটা সম্পন্ন করা যায়।
অন্যদিকে অ্যামাজন এ পথে না গিয়ে নিজেদের আলাদা কৌশল প্রয়োগ করছে। প্রতিষ্ঠানটি বাইরের এআই চ্যাটবটকে নিজেদের ওয়েবসাইট থেকে পণ্যের তথ্য সংগ্রহ করতে দিচ্ছে না। পাশাপাশি তারা গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে নিজস্ব এআই-ভিত্তিক শপিং সহকারী ‘রুফাস’ ব্যবহার করছে।
এআইয়ের বিস্তারে ডিজিটাল বিপণনের কৌশলেও বড় পরিবর্তন আসছে। দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন বিপণনের প্রধান ভিত্তি ছিল সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন বা এসইও। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান এআই-ভিত্তিক সার্চ অ্যানসার ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে শুধু কিওয়ার্ড ব্যবহার নয়, বরং পণ্যের বিস্তারিত বর্ণনা, ব্যবহারের ধরন, ক্রেতাদের মতামত বা পর্যালোচনা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।
তবে সব ক্ষেত্রেই এআই সমানভাবে কার্যকর নয়। অনেক ভোক্তা এখনো নিজের মতো করে বিভিন্ন দোকান বা পণ্য ঘেঁটে দেখার অভ্যাস পছন্দ করেন। তারা তুলনা করা, নতুন কিছু আবিষ্কার করা এবং নিজের সিদ্ধান্তে কেনাকাটা করার মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পান। সে কারণে প্রচলিত অনলাইন সার্চ ও সরাসরি কেনাকাটার পদ্ধতিও এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তার পরও বিশ্লেষকদের মতে, ছুটির মৌসুমে এআই আর পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। ক্রেতাদের আচরণ, কেনাকাটার ধরন ও রিটেইলারদের কৌশলে এআই এখন বাস্তব প্রভাব ফেলছে। ফলে বৈশ্বিক অনলাইন বাণিজ্যে এআই ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।